সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০২:৪৪ অপরাহ্ন
Logo
সর্বশেষ
● নিউইয়র্কে ট্যাক্সি চালিয়ে দেশে ছয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়লেন মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী ● কুমিল্লায় ওয়ার্ল্ড মিডিয়া প্রেস ক্লাবের সহসভাপতি নির্বাচিত হলেন সাংবাদিক শাহজাহান বাশার ● মাদক ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি পেলেন আইনজীবী হাবিবুল হক ● বাকেরগঞ্জে গণধর্ষণের অভিযোগ নিতে ওসির অস্বীকৃতি! উল্টো ভিকটিমকে ৭ বছরের জেলের ভয়! ● আইন, সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি: বিশেষ সম্মাননায় ভূষিত হলেন কুমিল্লার কৃতি সন্তান অ্যাডভোকেট হাবিবুল হক ● সুফিবাদ ও তাসাউফ তরিকতের মূল শিক্ষাই হলো ইসলামের মূল আদর্শ ও দর্শন-সাংবাদিক মোঃ শাহজাহান বাশার ● এডিএম স্টার অ্যাওয়ার্ড ২০২৫-এ বিশেষ অ্যাওয়ার্ড ও সম্মাননা পেলেন অ্যাডভোকেট মো. হাবিবুল হক ● শারদীয় দূর্গা পূজার আন্তর্জাতিক বিশ্বতান এর নাটক “সিদ্ধিদাতা গণেশ” ● আইন অঙ্গনে অবদানের স্বীকৃতি, ‘স্মার্ট এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড’ পেলেন হাবিবুল হক ● বাকেরগঞ্জে আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস উপলক্ষে র‍্যালি ও আলোচনা সভা

শহরটি ছিল নিউইয়র্ক, হৃদয়টি পড়ে ছিল ধান্যদৌলে

Reporter Name / ৪৪ Time View
Update : সোমবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৬

৬১

মোঃ শাহজাহান বাশার

এক হাতে ট্যাক্সির স্টিয়ারিং, অন্য হাতে জন্মভূমির মানুষের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার স্বপ্ন। নিউইয়র্ক শহরের ব্যস্ত সড়কে জীবিকার তাগিদে তিন দশকেরও বেশি সময় ট্যাক্সি চালিয়েছেন তিনি। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম করে উপার্জন করেছেন অর্থ। কিন্তু সেই অর্থের বড় একটি অংশ নিজের ভোগ-বিলাসে ব্যয় না করে বিনিয়োগ করেছেন নিজের শিকড়ের মানুষের ভবিষ্যতের জন্য।

তিনি মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী—কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার ধান্যদৌল গ্রামের সন্তান। প্রবাসে বসবাস করলেও তার হৃদয় পড়ে থাকে জন্মভূমির মাটি, গ্রামের মানুষ এবং আগামী প্রজন্মের কাছে। তার বিশ্বাস—একজন মানুষের প্রকৃত সাফল্য শুধু নিজের জীবনকে সুন্দর করে তোলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সেই সাফল্যের সুফল যদি সমাজের অন্য মানুষের জীবনেও আলো ছড়ায়, তবেই তা অর্থবহ হয়ে ওঠে।

মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর জীবনের গল্প তাই কেবল একজন প্রবাসী ট্যাক্সিচালকের গল্প নয়। এটি একজন মানুষের শিকড়ের প্রতি দায়বদ্ধতার গল্প। এটি স্বপ্ন দেখার এবং সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের গল্প। এটি প্রমাণ করে—সামর্থ্য সীমিত হলেও মানুষের ইচ্ছা, শ্রম, সততা ও মানবিক দায়বদ্ধতা যদি দৃঢ় হয়, তাহলে একজন মানুষও একটি জনপদের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।

নিউইয়র্ক—বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত মহানগর। অসংখ্য মানুষের ছুটে চলা, কর্মব্যস্ততা, প্রতিযোগিতা আর জীবিকার কঠিন বাস্তবতার মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ট্যাক্সির স্টিয়ারিং হাতে তুলে নিয়েছেন মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী।

প্রবাসজীবন বাইরে থেকে যতটা আকর্ষণীয় মনে হয়, বাস্তবে তা ততটাই সংগ্রামের। পরিবার, কর্মক্ষেত্র, দায়িত্ব ও প্রতিকূলতার মধ্যে নিজের অবস্থান তৈরি করতে একজন প্রবাসীকে প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হয়। মোশাররফ হোসেনও সেই কঠিন পথের পথিক।

তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ট্যাক্সি চালিয়ে অর্জিত প্রতিটি অর্থের পেছনে রয়েছে শ্রম, সময় ও আত্মত্যাগের গল্প। নিউইয়র্কের ব্যস্ত সড়কে দীর্ঘ কর্মঘণ্টা পার করার পাশাপাশি তিনি ভুলে যাননি নিজের গ্রামের কথা। ভুলে যাননি সেই মাটিকে, যে মাটি তাকে শৈশব দিয়েছে, পরিবার দিয়েছে, শেকড় দিয়েছে।

বরং যত দূরেই গেছেন, নিজের জন্মভূমির প্রতি তার টান যেন আরও গভীর হয়েছে।

মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর সমাজসেবার মূল দর্শন খুবই সরল—অর্থের অভাবে কোনো শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন যেন মাঝপথে থেমে না যায়।

বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে এখনো এমন বহু মেধাবী শিক্ষার্থী রয়েছে, যাদের স্বপ্ন আছে কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের সামর্থ্য নেই। পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভাব কিংবা প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার সংকটে অনেক শিক্ষার্থীকে একসময় পড়াশোনা ছেড়ে দিতে হয়।

এই বাস্তবতাই তাকে ভাবিয়েছে।

তিনি উপলব্ধি করেছেন—একজন শিক্ষার্থীকে সাহায্য করার অর্থ শুধু একজন মানুষকে সাহায্য করা নয়; বরং একটি পরিবার, একটি সমাজ এবং ভবিষ্যতের একটি প্রজন্মকে এগিয়ে নেওয়া।

এই বিশ্বাস থেকেই নিজের এলাকার শিক্ষা বিস্তারে তিনি দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ গ্রহণ করেন।

তার উদ্যোগ ও আর্থিক সহযোগিতায় নিজ এলাকায় গড়ে উঠেছে স্কুল, একাধিক কলেজ, প্রি-ক্যাডেট স্কুল, মাদ্রাসা, গ্রন্থাগার, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান এবং একটি ফাউন্ডেশন। এসব প্রতিষ্ঠান শুধু ইট-পাথরের স্থাপনা নয়; এগুলো একটি জনপদের মানুষের স্বপ্ন ও সম্ভাবনার সঙ্গে যুক্ত।

বর্তমান সময়ে অর্থ উপার্জন করা কঠিন। কিন্তু অর্থ উপার্জনের চেয়েও কঠিন হলো সেই অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা।

মানুষ সাধারণত নিজের আর্থিক সচ্ছলতা অর্জনের পর বাড়ি-গাড়ি, ব্যবসা কিংবা ব্যক্তিগত আরাম-আয়েশে বিনিয়োগ করে। এটি স্বাভাবিকও। কিন্তু নিজের অর্জিত অর্থের একটি বড় অংশ সমাজের শিক্ষা ও মানবিক উন্নয়নে ব্যয় করার মানসিকতা সবার মধ্যে দেখা যায় না।

মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর বিশেষত্ব এখানেই।

প্রবাসে কঠোর পরিশ্রম করে উপার্জিত অর্থ তিনি নিজের জন্মভূমির ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ব্যয় করেছেন। তার কাছে শিক্ষা ছিল সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ।

কারণ একটি স্কুল তৈরি হলে সেখানে শুধু একটি ভবন দাঁড়ায় না—দাঁড়িয়ে যায় বহু মানুষের স্বপ্ন। একটি কলেজ প্রতিষ্ঠিত হলে শুধু শ্রেণিকক্ষ তৈরি হয় না—তৈরি হয় উচ্চশিক্ষার নতুন সুযোগ। একটি গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠিত হলে শুধু বই রাখার জায়গা তৈরি হয় না—তৈরি হয় জ্ঞানচর্চার পরিবেশ।

এই দর্শন থেকেই তিনি তার এলাকার শিক্ষা অবকাঠামো গড়ে তোলার কাজে নিজেকে যুক্ত করেছেন।

প্রবাসে বসবাসকারী অনেক মানুষই সময়ের সঙ্গে জন্মভূমি থেকে দূরে সরে যান। কর্মজীবন, পরিবার ও নতুন বাস্তবতার ব্যস্ততায় গ্রামের সঙ্গে যোগাযোগ অনেক সময় সীমিত হয়ে আসে।

কিন্তু মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন।

হাজার হাজার মাইল দূরে থেকেও ধান্যদৌল গ্রামের সঙ্গে তার সম্পর্ক কখনো বিচ্ছিন্ন হয়নি। জন্মভূমির মানুষের সুখ-দুঃখ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক উন্নয়ন নিয়ে তিনি ভাবতেন।

নিজের বাবা-মায়ের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসাও তার সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডের অন্যতম অনুপ্রেরণা বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

মানুষের জীবনে বাবা-মা হচ্ছেন শেকড়ের মতো। সেই শেকড়ের প্রতি শ্রদ্ধা থেকেই হয়তো তিনি নিজের জন্মভূমির মানুষকে কিছু দেওয়ার তাগিদ অনুভব করেছেন।

এ যেন নিজের জীবনের অর্জন দিয়ে নিজের মাটির কাছে ফিরে আসার এক অন্যরকম প্রয়াস।

গ্রামাঞ্চলে শিক্ষার প্রসারে ব্যক্তিগত উদ্যোগ নতুন কোনো বিষয় নয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অনেক ব্যক্তি, প্রবাসী ও সমাজসেবক নিজ নিজ এলাকায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেছেন।

তবে বিদেশের মাটিতে দীর্ঘদিন কঠোর পরিশ্রম করে অর্জিত অর্থ দিয়ে নিজের এলাকায় দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা অবকাঠামোর একটি বিস্তৃত পরিসর গড়ে তোলার উদ্যোগ নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য।

মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর কর্মকাণ্ডকে তাই শুধু দান বা ব্যক্তিগত অনুদানের ঘটনা হিসেবে দেখলে এর ব্যাপ্তি কমিয়ে দেখা হবে।

এটি আসলে একটি সামাজিক বিনিয়োগ।

একজন মানুষ যখন একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন, তখন তার প্রভাব কয়েক বছর বা কয়েক দশকে সীমাবদ্ধ থাকে না। প্রজন্মের পর প্রজন্ম সেই প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষার্থী বের হয়। তাদের কেউ শিক্ষক হয়, কেউ চিকিৎসক, কেউ প্রকৌশলী, কেউ উদ্যোক্তা, কেউ সরকারি কর্মকর্তা, কেউ সমাজের অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে।

অর্থাৎ আজকের একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ আগামী দিনের একটি সম্পূর্ণ সমাজকে পরিবর্তনের সক্ষমতা রাখে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদান অপরিসীম। রেমিট্যান্সের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি অনেক প্রবাসী ব্যক্তি নিজ নিজ এলাকায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, অবকাঠামো ও সামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখছেন।

মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর উদ্যোগ সেই বৃহত্তর প্রবাসী অবদানের একটি স্থানীয় দৃষ্টান্ত।

তার জীবন থেকে প্রবাসী সমাজের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়—দেশের বাইরে থাকলেও দেশের জন্য কাজ করার সুযোগ থাকে।

দেশে ফিরে এসে সবসময় কাজ করতে হবে—এমন কোনো কথা নেই। দূরদেশে থেকেও নিজের এলাকার মানুষের জন্য কিছু করা সম্ভব। প্রয়োজন শুধু দায়বদ্ধতা ও ইচ্ছাশক্তির।

প্রবাসে অর্জিত অর্থ যদি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের মতো দীর্ঘমেয়াদি খাতে বিনিয়োগ করা যায়, তাহলে তার সুফল শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো সমাজ পেতে পারে।

মানুষকে একদিনের জন্য সাহায্য করা সহজ। কিন্তু তাকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দেওয়া অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

একজন দরিদ্র শিক্ষার্থীকে একবার অর্থ সহায়তা করা নিঃসন্দেহে মানবিক কাজ। কিন্তু তার জন্য একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, একটি লাইব্রেরি কিংবা একটি স্থায়ী শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করে দেওয়া আরও বড় কাজ।

কারণ এতে শুধু একজন নয়, অসংখ্য মানুষ উপকৃত হওয়ার সুযোগ পায়।

মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর কর্মকাণ্ডের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্ভবত এখানেই। তিনি শুধু ব্যক্তিকে সহায়তা করার চিন্তায় সীমাবদ্ধ থাকেননি; বরং প্রতিষ্ঠান ও অবকাঠামো গড়ে তোলার মাধ্যমে দীর্ঘস্থায়ী সুযোগ তৈরির চেষ্টা করেছেন।

এটি সমাজসেবার এমন একটি মডেল, যার প্রভাব সময়ের সঙ্গে আরও বিস্তৃত হতে পারে।

সমাজে অনেক মানুষ আছেন, যারা আলোচনার কেন্দ্রে থাকতে চান না। প্রচার-প্রচারণার চেয়ে কাজকেই তারা বেশি গুরুত্ব দেন।

মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর গল্পও তেমন একটি নীরব অবদানের গল্প হিসেবে সামনে আসে।

নিউইয়র্কের রাস্তায় ট্যাক্সি চালানো একজন সাধারণ প্রবাসী শ্রমজীবী মানুষ কীভাবে নিজের অর্জিত অর্থ দিয়ে জন্মভূমির মানুষের জন্য শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্র তৈরি করতে পারেন—তার জীবন সেই প্রশ্নের একটি বাস্তব উত্তর।

তার হাতে হয়তো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নেই, বড় কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই, কিন্তু আছে মানুষের জন্য কিছু করার ইচ্ছা। আর সেই ইচ্ছাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য রয়েছে দীর্ঘদিনের শ্রমে অর্জিত অর্থ ও আত্মত্যাগ।

সমাজ পরিবর্তনের ইতিহাসে এমন মানুষের অবদান অনেক সময় বড় শিরোনাম পায় না। কিন্তু তাদের তৈরি করা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষিত প্রজন্ম এবং উপকৃত মানুষের জীবনই একদিন তাদের কাজের সবচেয়ে বড় সাক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়।

একজন মানুষের জীবন কখনো কখনো একটি দীর্ঘ ভ্রমণের মতো। জন্মভূমির একটি ছোট্ট গ্রাম থেকে শুরু করে বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত মহানগরে গিয়ে জীবিকার সংগ্রাম, তারপর সেই অর্জন নিয়ে আবার জন্মভূমির মানুষের কাছে ফিরে আসা—মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর জীবনযাত্রাকে এভাবেই দেখা যায়।

ধান্যদৌল তার শেকড়। নিউইয়র্ক তার কর্মক্ষেত্র। আর মানুষের কল্যাণ তার স্বপ্ন।

এই তিনটি বিষয়কে একসূত্রে গেঁথেই যেন তার জীবনের গল্প তৈরি হয়েছে।

প্রবাসের রাস্তায় ট্যাক্সির স্টিয়ারিং হাতে বসে থাকা মানুষটি হয়তো প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের গন্তব্যে পৌঁছে দিয়েছেন। কিন্তু নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় গন্তব্য হিসেবে বেছে নিয়েছেন নিজের জন্মভূমির মানুষের ভবিষ্যৎকে।

এটি নিঃসন্দেহে এক বিরল মানসিকতার পরিচয়।

মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর জীবন আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও রেখে যায়—আমরা প্রত্যেকে আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী সমাজের জন্য কতটুকু করছি?

সবাই হয়তো স্কুল বা কলেজ প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না। সবাই হয়তো বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে পারবে না। কিন্তু একজন শিক্ষার্থীকে বই কিনে দেওয়া, কারও পড়াশোনার খরচ বহন করা, একটি গাছ লাগানো, একজন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো কিংবা একজন তরুণকে সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়াও সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান।

সমাজ পরিবর্তন সবসময় বড় কোনো আয়োজন দিয়ে শুরু হয় না। অনেক সময় একজন মানুষের ছোট্ট একটি উদ্যোগই একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা করে।

মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর ক্ষেত্রে সেই ছোট্ট স্বপ্নটি ছিল—অর্থের অভাবে কোনো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন যেন থেমে না যায়।

সেই স্বপ্ন আজ বহু মানুষের শিক্ষার সুযোগ তৈরির মধ্য দিয়ে বাস্তবতার রূপ পেয়েছে।

জীবনের সাফল্যের সংজ্ঞা সবার কাছে এক নয়। কারও কাছে সাফল্য অর্থ, সম্পদ ও প্রতিষ্ঠা; কারও কাছে পরিবারকে ভালো রাখা; আবার কারও কাছে মানুষের জন্য কিছু করে যাওয়াই জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন।

মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর জীবনকে সেই তৃতীয় দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখা যায়।

নিউইয়র্কের ব্যস্ত সড়কে তিন দশকেরও বেশি সময় ট্যাক্সি চালিয়ে কঠোর পরিশ্রম করেছেন তিনি। কিন্তু সেই শ্রমের অর্জনকে শুধু নিজের মধ্যে আটকে রাখেননি। জন্মভূমির মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক উন্নয়নে তা বিনিয়োগ করেছেন।

একজন প্রবাসী শ্রমজীবী মানুষের এই আত্মত্যাগ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—দেশের প্রতি ভালোবাসা শুধু দেশে বসবাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। হাজার হাজার মাইল দূরে থেকেও একজন মানুষ তার শেকড়, সমাজ ও দেশের মানুষের জন্য কাজ করতে পারেন।

হয়তো এ কারণেই মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর গল্প কেবল একজন ব্যক্তির গল্প নয়। এটি প্রবাসের ঘাম, মাটির প্রতি ভালোবাসা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দায়বদ্ধতার গল্প।

ট্যাক্সির স্টিয়ারিংয়ে কেটে যাওয়া জীবনের দীর্ঘ তিন দশকের শ্রম আজ যদি কোনো শিক্ষার্থীর চোখে নতুন স্বপ্ন জাগায়, কোনো পরিবারের সন্তানকে উচ্চশিক্ষার সুযোগ দেয়, কোনো তরুণকে আলোর পথে এগিয়ে দেয়—তাহলেই তার সেই দীর্ঘ শ্রম সত্যিকার অর্থে সার্থক।

কারণ মানুষের জন্য রেখে যাওয়া শিক্ষা ও মানবিকতার আলোই শেষ পর্যন্ত একটি জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়ে থাকে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

উপদেষ্টা পর্ষদ

প্রধান উপদেষ্টা
হুমায়ুন কবির জীবন
উপদেষ্টা ও পৃষ্ঠপোষক
আবুল হাসানাত
সম্পাদকীয় উপদেষ্টা
মোঃ শাহরিয়া সিকদার

সম্পাদকীয় পর্ষদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
মোঃ শরিফ হোসেন
নির্বাহী সম্পাদক
মোঃ শাহজাহান বাশার
উপসম্পাদক
সালাম মিয়া

কার্যালয় ও যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়

২ নং, উত্তর দুর্গাপুর ইউনিয়ন কৃষ্ণনগর। কুমিল্লা আদর্শ সদর

যোগাযোগ

+
+

ডিজাইন ও প্রযুক্তি সহায়তায়ঃ