সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০৯:৫৭ অপরাহ্ন
Logo
সর্বশেষ
● বাকশীমূল ইউনিয়নের আগামীর নেতৃত্ব নিয়ে তরুণদের ভাবনা, আলোচনায় আরিফুল ইসলাম রাব্বি ● নিউইয়র্কে ট্যাক্সি চালিয়ে দেশে ছয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়লেন মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী ● কুমিল্লায় ওয়ার্ল্ড মিডিয়া প্রেস ক্লাবের সহসভাপতি নির্বাচিত হলেন সাংবাদিক শাহজাহান বাশার ● মাদক ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি পেলেন আইনজীবী হাবিবুল হক ● বাকেরগঞ্জে গণধর্ষণের অভিযোগ নিতে ওসির অস্বীকৃতি! উল্টো ভিকটিমকে ৭ বছরের জেলের ভয়! ● আইন, সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি: বিশেষ সম্মাননায় ভূষিত হলেন কুমিল্লার কৃতি সন্তান অ্যাডভোকেট হাবিবুল হক ● সুফিবাদ ও তাসাউফ তরিকতের মূল শিক্ষাই হলো ইসলামের মূল আদর্শ ও দর্শন-সাংবাদিক মোঃ শাহজাহান বাশার ● এডিএম স্টার অ্যাওয়ার্ড ২০২৫-এ বিশেষ অ্যাওয়ার্ড ও সম্মাননা পেলেন অ্যাডভোকেট মো. হাবিবুল হক ● শারদীয় দূর্গা পূজার আন্তর্জাতিক বিশ্বতান এর নাটক “সিদ্ধিদাতা গণেশ” ● আইন অঙ্গনে অবদানের স্বীকৃতি, ‘স্মার্ট এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড’ পেলেন হাবিবুল হক

প্রতিটি শিশুর স্বপ্ন হোক সমান, সুযোগও হোক সমান- সাংবাদিক মোঃ শাহজাহান বাশার

Reporter Name / ৬২ Time View
Update : মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট, ২০২৬

৮৫

নিজস্ব প্রতিবেদন

একটি শিশু জন্ম নেয় স্বপ্ন নিয়ে। কেউ স্বপ্ন দেখে ডাক্তার হবে, কেউ শিক্ষক, কেউ প্রকৌশলী, কেউ বিজ্ঞানী, কেউ উদ্যোক্তা, আবার কেউ এমন একটি জীবন গড়তে চায় যেখানে নিজের পরিবার ও সমাজের জন্য কিছু করতে পারবে। কিন্তু পৃথিবীর সব শিশুর স্বপ্ন কি সমানভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ পায়? একটি শিশুর মেধা, পরিশ্রম ও স্বপ্ন যদি তার জন্মপরিবার, আর্থিক সামর্থ্য, বসবাসের এলাকা কিংবা শিক্ষার পরিবেশের কাছে বারবার বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে শুধু তাকে ‘শিক্ষার অধিকার দেওয়া হয়েছে’ বললেই কি রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়? নিশ্চয়ই নয়। একটি মানবিক ও উন্নয়নমুখী রাষ্ট্রের প্রকৃত দায়িত্ব হলো এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে প্রতিটি শিশুর স্বপ্ন দেখার অধিকার যেমন সমান থাকবে, তেমনি সেই স্বপ্ন পূরণের সুযোগও যতটা সম্ভব সমান ও ন্যায্য হবে।

শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার। কিন্তু শিক্ষার অধিকার শুধু বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি শিশুকে বিদ্যালয়ে নিয়ে যাওয়া যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তাকে মানসম্মত শিক্ষক, নিরাপদ পরিবেশ, প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ, প্রযুক্তির সুযোগ, পুষ্টি, মানসিক সহায়তা এবং নিজের মেধা ও সৃজনশীলতা বিকাশের সুযোগ দেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকা আর প্রকৃত অর্থে শেখা এক বিষয় নয়। বিশ্বব্যাংকের Bangladesh Learning Poverty Brief 2024 অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার শেষ পর্যায়ের বয়সী প্রায় ৫১ শতাংশ শিশু বয়স অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পড়া বুঝে পড়ার ন্যূনতম দক্ষতায় পৌঁছাতে পারছে না। এই তথ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শিক্ষার ক্ষেত্রে শুধু প্রবেশাধিকার নয়, শেখার মান এবং শেখার ফলাফল নিশ্চিত করাও এখন বড় জাতীয় অগ্রাধিকার।

একজন শিশুর হাতে যদি বইয়ের পাশাপাশি কম্পিউটার, স্মার্টফোন, দ্রুতগতির ইন্টারনেট, শান্ত পড়ার পরিবেশ, শিক্ষিত অভিভাবকের সহযোগিতা ও অতিরিক্ত শিক্ষাসহায়তা থাকে, আর অন্য শিশুটির কাছে যদি বিদ্যালয়ের বই ছাড়া আর কোনো সহায়তা না থাকে, তাহলে কাগজে দুজন শিক্ষার্থীর সুযোগ হয়তো একই মনে হতে পারে; কিন্তু বাস্তবে তাদের শিক্ষাজীবনের ভিত্তি এক নয়। একজন বিদ্যালয় থেকে ফিরে অনলাইনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষাসামগ্রী ব্যবহার করতে পারে, অন্যজন হয়তো পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে পড়াশোনার পাশাপাশি নানা দায়িত্ব পালন করে। একজন ভুল করলে তার পাশে দাঁড়ানোর মতো একাধিক সহায়তার ব্যবস্থা থাকে, অন্যজনের ভুল সংশোধনের সুযোগ সীমিত। তাই শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রকৃত সমতা মানে সবাইকে একই বই বা একই পরীক্ষা দেওয়া নয়; প্রকৃত সমতা হলো প্রত্যেক শিশুকে তার প্রয়োজন অনুযায়ী এমন সহায়তা দেওয়া, যাতে সে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী এগিয়ে যেতে পারে।

বাংলাদেশ শিক্ষা ক্ষেত্রে গত কয়েক দশকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করেছে। শিশুদের বিদ্যালয়ে আনার ক্ষেত্রে নানা কর্মসূচি, উপবৃত্তি, বিনামূল্যে পাঠ্যবই এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে শিক্ষার চ্যালেঞ্জও বদলেছে। এখন শুধু কতজন শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে গেল, কতজন পরীক্ষায় অংশ নিল কিংবা কতজন পাস করল—এসব দিয়ে শিক্ষার পূর্ণ সাফল্য বিচার করা যাবে না। আমাদের দেখতে হবে, একজন শিক্ষার্থী কতটা শিখল, সে নিজের ভাষায় চিন্তা প্রকাশ করতে পারছে কি না, বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধান করতে পারছে কি না, প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারছে কি না এবং ভবিষ্যতের কর্মজগতের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে পারছে কি না। কারণ একটি সার্টিফিকেট শিক্ষাজীবনের একটি ফলাফল হতে পারে, কিন্তু জ্ঞান, দক্ষতা, মূল্যবোধ ও সৃজনশীলতাই একজন মানুষকে দীর্ঘমেয়াদে এগিয়ে নেয়।

এই বাস্তবতায় শিক্ষা খাতে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে বৃহত্তর শিক্ষা খাতে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। শিক্ষা খাতে রাষ্ট্রের এই আর্থিক অঙ্গীকার নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তবে বরাদ্দের পরিমাণের পাশাপাশি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই অর্থের সুফল কতটা শ্রেণিকক্ষে পৌঁছাচ্ছে এবং সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থী কতটা উপকৃত হচ্ছে। একটি বিদ্যালয়ে আধুনিক ভবন নির্মাণ করা হলো, কিন্তু পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই; কম্পিউটার দেওয়া হলো, কিন্তু ইন্টারনেট নেই; নতুন পাঠ্যক্রম চালু করা হলো, কিন্তু শিক্ষকরা পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ পেলেন না—তাহলে সেই বিনিয়োগ কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না। শিক্ষা খাতে ব্যয়ের প্রকৃত সাফল্য তখনই, যখন তার প্রভাব একজন শিক্ষার্থীর শেখার সক্ষমতা, আত্মবিশ্বাস ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার ওপর দৃশ্যমান হয়।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও শিক্ষায় সমান সুযোগের বিষয়টি এখন বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। UNESCO-এর ২০২৬ Global Education Monitoring Report শিক্ষা বৈষম্য কমাতে ন্যায্য অর্থায়নের গুরুত্ব তুলে ধরেছে। অর্থাৎ শুধু শিক্ষা খাতে অর্থ বরাদ্দ করলেই হবে না; সেই অর্থ যেন প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষার্থী, বিদ্যালয় ও অঞ্চলের কাছে পৌঁছায়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশের মতো একটি দেশে যেখানে শহর, গ্রাম, চরাঞ্চল, পাহাড়ি এলাকা কিংবা দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের বাস্তবতা এক নয়, সেখানে সবার জন্য একই ধরনের সহায়তা সবসময় ন্যায্য ফল দেবে না। বরং যেসব শিক্ষার্থী ও অঞ্চল বেশি পিছিয়ে আছে, তাদের জন্য প্রয়োজনভিত্তিক অতিরিক্ত বিনিয়োগ দরকার।

আমাদের মনে রাখতে হবে, শিক্ষার বৈষম্য শুধু শহর ও গ্রামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একই শহরের মধ্যেও শিক্ষার সুযোগে বড় পার্থক্য থাকতে পারে। একটি পরিবারের সন্তান হয়তো নামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ছে, নিয়মিত কোচিং করছে, ব্যক্তিগত শিক্ষক পাচ্ছে এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। অন্য পরিবারের সন্তান হয়তো সীমিত সুযোগের বিদ্যালয়ে পড়ছে এবং বাড়িতেও পড়াশোনার অনুকূল পরিবেশ পাচ্ছে না। তারপরও দুজন একই পরীক্ষায় বসছে এবং একই নম্বরের ভিত্তিতে মূল্যায়িত হচ্ছে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকেই যায়—প্রতিযোগিতার নিয়ম একই হলেই কি প্রতিযোগিতার সুযোগও সমান হয়ে যায়? যদি শুরুর অবস্থান এক না হয়, তাহলে ফলাফলকে শুধু মেধা ও পরিশ্রমের প্রতিফলন হিসেবে দেখা কতটা ন্যায়সংগত?

এই জায়গায় শিক্ষকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রাণ হলো তার শিক্ষক। একজন দক্ষ ও মানবিক শিক্ষক একটি শিক্ষার্থীর জীবন বদলে দিতে পারেন। তিনি শুধু পাঠ্যবই পড়ান না; তিনি প্রশ্ন করতে শেখান, যুক্তি দিয়ে চিন্তা করতে শেখান, ভুল থেকে শিক্ষা নিতে শেখান এবং নিজের সামর্থ্যের ওপর বিশ্বাস রাখতে শেখান। তাই শিক্ষার মান উন্নয়নের আলোচনায় শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি প্রশিক্ষণ, পেশাগত মর্যাদা, কর্মপরিবেশ, জবাবদিহি এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে দক্ষ শিক্ষক ধরে রাখার বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে। একজন শিক্ষককে শুধু দায়িত্ব দিলে হবে না; সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের জন্য তাকে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, সহায়তা ও সম্মানও দিতে হবে।

একই সঙ্গে আমাদের পরীক্ষা ও মূল্যায়ন ব্যবস্থাকেও সময়ের সঙ্গে আরও আধুনিক করতে হবে। একজন শিক্ষার্থী কত নম্বর পেল—এটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু নম্বর তার সম্পূর্ণ মেধা ও সম্ভাবনার একমাত্র মাপকাঠি হতে পারে না। বর্তমান বিশ্বের প্রতিযোগিতামূলক বাস্তবতায় সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধান, যোগাযোগ, দলগত কাজ, গবেষণার মানসিকতা, প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা এবং নতুন কিছু শেখার সক্ষমতার গুরুত্ব বাড়ছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তারের যুগে শুধু তথ্য মুখস্থ করার চেয়ে তথ্য বিশ্লেষণ করা, সত্যতা যাচাই করা, যুক্তি দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং প্রযুক্তিকে দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করার ক্ষমতা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে তাই শুধু পরীক্ষার জন্য নয়, জীবন ও ভবিষ্যৎ কর্মজগতের জন্যও শিক্ষার্থী প্রস্তুত করতে হবে।

কোচিং ও অতিরিক্ত শিক্ষাসহায়তার বিষয়টিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। কোচিংকে এক কথায় ভালো বা খারাপ বলে বিচার করার পরিবর্তে আমাদের ভাবতে হবে, কেন বিদ্যালয়ের বাইরে অতিরিক্ত শিক্ষার ওপর এত নির্ভরতা তৈরি হয়েছে। যদি ভালো ফল করার জন্য পরিবারের বাড়তি অর্থ ব্যয়ের সামর্থ্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই সুযোগের ব্যবধান বাড়ে। যে পরিবার কোচিং, প্রাইভেট শিক্ষক, ইন্টারনেট, কম্পিউটার বা আধুনিক ডিভাইসের জন্য অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে পারে, তাদের সন্তান বাড়তি সুবিধা পায়। তাই বিদ্যালয়কেন্দ্রিক মানসম্মত শিক্ষা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন, যাতে একজন শিক্ষার্থীর সাফল্য তার পরিবারের আর্থিক সামর্থ্যের ওপর অতিরিক্তভাবে নির্ভরশীল না হয়।

প্রযুক্তি আজ শিক্ষার ক্ষেত্রে এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। একজন শিক্ষার্থী এখন ঘরে বসেই বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষামূলক প্ল্যাটফর্মের জ্ঞানভাণ্ডারে প্রবেশ করতে পারে। কিন্তু প্রযুক্তির এই সুযোগও সবার জন্য সমান নয়। কারও হাতে আধুনিক ডিভাইস ও দ্রুতগতির ইন্টারনেট আছে, কারও কাছে নেই। কেউ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুবিধা সম্পর্কে জানে, আবার কেউ এখনো মৌলিক ডিজিটাল দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পায়নি। তাই প্রযুক্তিকে শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করার সময় শুধু ডিভাইস বিতরণ নয়; শিক্ষক প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল সাক্ষরতা, নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট এবং প্রযুক্তির নৈতিক ও দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করাও প্রয়োজন। প্রযুক্তি যেন নতুন বৈষম্য তৈরি না করে, বরং বিদ্যমান বৈষম্য কমানোর শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে ওঠে—এটাই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য।

বাংলাদেশের শিক্ষা ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, অতিরিক্ত তাপপ্রবাহ ও অন্যান্য দুর্যোগে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়মিতভাবে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়। UNICEF-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে প্রায় ৩ কোটি ৫০ লাখ শিশুর শিক্ষা কোনো না কোনোভাবে জলবায়ুজনিত দুর্যোগে ব্যাহত হয়েছিল। এই বাস্তবতা আমাদের সামনে একটি নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। ভবিষ্যতের বিদ্যালয় শুধু সুন্দর ভবন হলেই হবে না; সেটিকে হতে হবে দুর্যোগ-সহনশীল, নিরাপদ এবং প্রয়োজনে বিকল্প উপায়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতাসম্পন্ন। কারণ একটি শিশুর শিক্ষা বারবার বন্ধ হয়ে গেলে তার শেখার ধারাবাহিকতা যেমন নষ্ট হয়, তেমনি ঝরে পড়ার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষাকেও আমাদের আরও মর্যাদার জায়গায় নিয়ে যেতে হবে। আমাদের সমাজে এখনো অনেক পরিবার মনে করে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ডিগ্রিই সাফল্যের প্রধান পথ। অথচ আধুনিক অর্থনীতিতে দক্ষ প্রযুক্তিবিদ, ইলেকট্রিশিয়ান, মেকানিক, কৃষি উদ্যোক্তা, সফটওয়্যার কর্মী, ডিজিটাল প্রযুক্তিবিদ ও বিভিন্ন কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন মানুষের প্রয়োজন ক্রমেই বাড়ছে। একটি দেশের উন্নয়ন শুধু ডিগ্রিধারীর সংখ্যা দিয়ে হয় না; প্রয়োজন দক্ষ, উৎপাদনশীল ও উদ্ভাবনী মানবসম্পদ। তাই একাডেমিক ও কারিগরি শিক্ষার মধ্যে মর্যাদার বিভাজন দূর করা এবং শিক্ষাকে কর্মবাজারের প্রয়োজনের সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করা সময়ের দাবি।

তবে শিক্ষা শুধু চাকরি পাওয়ার পথ নয়। শিক্ষা একজন মানুষকে ভালো নাগরিক, দায়িত্বশীল মানুষ এবং মানবিক সমাজের অংশ হিসেবে গড়ে তোলারও প্রধান মাধ্যম। একজন মানুষ উচ্চশিক্ষিত হলেই তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সৎ, মানবিক ও দায়িত্বশীল হয়ে ওঠেন না। তাই শিক্ষার সঙ্গে নৈতিকতা, সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, মানবিকতা, যুক্তিবোধ ও সামাজিক দায়িত্বের শিক্ষা যুক্ত করতে হবে। একজন শিক্ষার্থীকে শুধু কীভাবে ভালো ফল করতে হয় তা শেখালে হবে না; তাকে শেখাতে হবে কীভাবে ভালো মানুষ হতে হয়, কীভাবে অন্যের অধিকারকে সম্মান করতে হয় এবং কীভাবে নিজের জ্ঞানকে সমাজ ও দেশের কল্যাণে কাজে লাগাতে হয়।

এ কারণেই শিক্ষা নিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পরিকল্পনা ও ঐকমত্য প্রয়োজন। সরকার পরিবর্তন হতে পারে, নীতি পরিবর্তিত হতে পারে, কিন্তু একটি শিশুর শিক্ষা নিয়ে রাষ্ট্রের মৌলিক অঙ্গীকার পরিবর্তিত হওয়া উচিত নয়। প্রাথমিক শিক্ষা থেকে উচ্চশিক্ষা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ থেকে কারিগরি শিক্ষা, ডিজিটাল শিক্ষা থেকে গবেষণা—সবকিছুকে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। শিক্ষা এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে দল-মত নির্বিশেষে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। কারণ আজকের একটি শিশুই আগামী দিনের শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, উদ্যোক্তা, সাংবাদিক, বিজ্ঞানী, কৃষিবিদ, প্রশাসক কিংবা রাষ্ট্রের নেতৃত্বদানকারী নাগরিক হবে।

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার সাফল্য মাপার পদ্ধতিও আরও বাস্তবভিত্তিক হওয়া দরকার। কতজন ভর্তি হলো, কতজন পরীক্ষা দিল কিংবা কতজন পাস করল—এসব তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও এগুলো শিক্ষার সম্পূর্ণ চিত্র নয়। আমাদের জানতে হবে, কে শিখল, কতটা শিখল, কে পিছিয়ে রইল, কেন পিছিয়ে রইল এবং তাকে এগিয়ে আনতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। শিক্ষা খাতে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের প্রকৃত মূল্যায়নও হওয়া উচিত এই প্রশ্নে—সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা শিশুটির জীবনে কতটা পরিবর্তন এসেছে?

একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন শুধু রাস্তা, সেতু, ভবন কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানে মাপা যায় না। প্রকৃত উন্নয়ন মাপা যায় সেই দেশের মানুষের জ্ঞান, দক্ষতা, সৃজনশীলতা, নৈতিকতা ও মানবিকতায়। আর সেই মানুষ তৈরির সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হলো শিক্ষা। তাই শিক্ষা খাতে বিনিয়োগকে শুধু ব্যয় হিসেবে দেখলে চলবে না; এটিকে দেশের ভবিষ্যতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে।

একজন শিশু দরিদ্র পরিবারে জন্মেছে—এটি তার অপরাধ নয়। সে প্রত্যন্ত অঞ্চলে জন্মেছে—এটিও তার অপরাধ নয়। তার বাবা-মা অতিরিক্ত শিক্ষার ব্যয় বহন করতে পারেন না—এটিও তার অপরাধ নয়। তার বিদ্যালয়ে প্রযুক্তির সুযোগ সীমিত—এটিও তার অপরাধ নয়। তাহলে তার স্বপ্ন কেন ছোট হবে? তার মেধা কেন সুযোগের অভাবে হারিয়ে যাবে? একটি শিশুর জন্মপরিস্থিতি তার ভবিষ্যতের সীমা নির্ধারণ করবে—এমন সমাজ আমরা চাই না।

আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে গ্রামের একটি শিশুও বিশ্বমানের শিক্ষা পাওয়ার স্বপ্ন দেখতে পারে; যেখানে দরিদ্র পরিবারের সন্তানও সম্মানের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারে; যেখানে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী প্রয়োজনীয় সহায়তা নিয়ে নিজের সম্ভাবনা বিকশিত করতে পারে; যেখানে প্রযুক্তি বৈষম্যের দেয়াল না হয়ে সুযোগের সেতু হয়; যেখানে একজন শিক্ষককে জাতি গঠনের অন্যতম প্রধান কারিগর হিসেবে সম্মান করা হয়; এবং যেখানে একটি শিশুর সাফল্য তার পরিবারের আর্থিক সামর্থ্যের চেয়ে তার মেধা, পরিশ্রম ও সম্ভাবনার ওপর বেশি নির্ভর করবে।

কারণ মেধার কোনো ঠিকানা নেই। স্বপ্নের কোনো শ্রেণি নেই। প্রতিভার কোনো শহর-গ্রাম নেই। কিন্তু সেই মেধা, স্বপ্ন ও প্রতিভাকে বিকশিত করার জন্য সুযোগের প্রয়োজন। আর সেই সুযোগ নিশ্চিত করা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি পরিবার, শিক্ষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্র—সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। তবে ন্যায্য সুযোগের কাঠামো তৈরি এবং পিছিয়ে থাকা শিশুর পাশে দাঁড়ানোর নেতৃত্ব রাষ্ট্রকেই দিতে হবে।

আজ তাই আমাদের অঙ্গীকার হোক—কোনো শিশুর স্বপ্ন যেন তার পরিবারের আর্থিক অবস্থার কাছে হার না মানে। কোনো মেধা যেন সুযোগের অভাবে হারিয়ে না যায়। কোনো শিক্ষার্থী যেন শুধু জন্মস্থান বা সামাজিক অবস্থানের কারণে পিছিয়ে না পড়ে। শিক্ষা যেন শুধু সনদ অর্জনের পথ না হয়ে প্রতিটি শিশুর সম্ভাবনা বিকাশের সেতু হয়ে ওঠে।

একটি শিশুর হাতে যখন বই তুলে দেওয়া হয়, তখন শুধু একটি বই দেওয়া হয় না; তার হাতে তুলে দেওয়া হয় একটি সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ। একটি বিদ্যালয়ের দরজা যখন তার জন্য খুলে দেওয়া হয়, তখন শুধু একটি শ্রেণিকক্ষের দরজা খোলে না; খুলে যায় একটি নতুন পৃথিবীর দরজা। আর সেই পৃথিবীতে প্রবেশের সুযোগ যদি সবার জন্য ন্যায্য হয়, তাহলে একটি প্রজন্ম বদলে যেতে পারে, বদলে যেতে পারে একটি সমাজ, এমনকি বদলে যেতে পারে একটি দেশ।

তাই আমাদের লক্ষ্য শুধু এমন শিক্ষা ব্যবস্থা নয় যেখানে সবাই বিদ্যালয়ে যাবে; আমাদের লক্ষ্য এমন শিক্ষা ব্যবস্থা, যেখানে সবাই শেখার সুযোগ পাবে, সবাই নিজের সম্ভাবনা বিকশিত করতে পারবে এবং কেউ জন্মপরিস্থিতির কারণে তার স্বপ্ন থেকে বঞ্চিত হবে না।

কারণ একটি দেশের ভবিষ্যৎ তার শিশুদের স্বপ্নের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে।

প্রতিটি শিশুর স্বপ্ন হোক সমান, সুযোগও হোক সমান। লেখক: সাংবাদিক মোঃ শাহজাহান বাশার


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

উপদেষ্টা পর্ষদ

প্রধান উপদেষ্টা
হুমায়ুন কবির জীবন
উপদেষ্টা ও পৃষ্ঠপোষক
আবুল হাসানাত
সম্পাদকীয় উপদেষ্টা
মোঃ শাহরিয়া সিকদার

সম্পাদকীয় পর্ষদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
মোঃ শরিফ হোসেন
নির্বাহী সম্পাদক
মোঃ শাহজাহান বাশার
উপসম্পাদক
সালাম মিয়া

কার্যালয় ও যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়

২ নং, উত্তর দুর্গাপুর ইউনিয়ন কৃষ্ণনগর। কুমিল্লা আদর্শ সদর

যোগাযোগ

+
+

ডিজাইন ও প্রযুক্তি সহায়তায়ঃ