আজ ৯ জুলাই ২০২৬, প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ, সাবেক সিনিয়র মন্ত্রী এবং ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)-এর সাবেক চেয়ারম্যান মশিউর রহমান যাদু মিয়ার ১০২তম জন্মবার্ষিকী। ১৯২৪ সালের এই দিনে তিনি নীলফামারী জেলার ডিমলা উপজেলার খগাখড়িবাড়ী গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। গণতন্ত্র, মানুষের অধিকার এবং জনকল্যাণমূলক রাজনীতিতে অনন্য অবদানের কারণে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তিনি আজও এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।
ছাত্রজীবন থেকেই জনসেবামূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হন যাদু মিয়া। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বার্মায় (মিয়ানমার) যুদ্ধাহতদের সেবায় অংশ নিয়েছিলেন তিনি। ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ ও মহামারির সময় রংপুর অঞ্চলের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে মানবিক দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর এই অনন্য জনসেবামূলক কর্মকাণ্ডের স্মৃতি বহন করে আজও একটি এলাকার নাম রয়েছে ‘যাদুর চর’।
১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় সাহসী ভূমিকা রাখেন তিনি। সে সময় দাঙ্গার ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে বিশেষ বুলেটিন প্রকাশ করায় ব্রিটিশ সরকারের রোষানলে পড়েন এবং গ্রেপ্তার হন। পরবর্তীতে বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তিনি মুক্তি লাভ করেন।
রাজনৈতিক জীবনে তিনি ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)-এর অন্যতম শীর্ষ নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ১৯৫৭ সালের ঐতিহাসিক কাগমারী সম্মেলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন এবং পরবর্তীতে ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক ও চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬২ সালে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়ে তিনি বিরোধী দলের উপনেতার দায়িত্ব পালন করেন। আইয়ুববিরোধী আন্দোলন, স্বাধিকার সংগ্রাম এবং প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তাঁর নেতৃত্ব ছিল দৃঢ় ও আপসহীন।
১৯৬৯ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের টোবাটেক সিং কৃষক সম্মেলনে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে জোরালো বক্তব্য দেওয়ায় তাঁকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ ঢাকার পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক জনসভায় ন্যাপের পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ এবং প্রতীকী পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে স্বাধীনতা আন্দোলনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি।
স্বাধীনতার পরও দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন যাদু মিয়া। মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর মৃত্যুর পর তিনি ন্যাপের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে দেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতিকে সুসংহত করার লক্ষ্যে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সঙ্গে রাজনৈতিক সংলাপে অংশ নেন এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ায় মূল চালিকাশক্তি হিসেবে অবদান রাখেন। ১৯৭৯ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির বিপুল বিজয়ের পেছনেও তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা ছিল উল্লেখযোগ্য।
রাজনীতিতে প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা, সততা ও ত্যাগের জন্য মশিউর রহমান যাদু মিয়া সর্বমহলে সমাদৃত ও সম্মানিত ছিলেন। বাম-ডান—সব রাজনৈতিক ধারার নেতাদের সঙ্গেই ছিল তাঁর চমৎকার সুসম্পর্ক। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাদাসিধে, মানবিক ও আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন একজন মানুষ।
১৯৭৯ সালের ১২ মার্চ এই মহান নেতা মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর প্রয়াণের চার দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ, গণমানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং গণতন্ত্রের জন্য আত্মত্যাগ আজও দেশবাসীকে অনুপ্রাণিত করে।
আজ তাঁর ১০২তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ডিমলাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের উদ্যোগে স্মরণসভা, দোয়া মাহফিল, পুষ্পস্তবক অর্পণ এবং আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, বিশিষ্টজন ও সাধারণ মানুষ জাতীয় এই নেতার স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছেন।
স্থানীয়দের মতে, ডিমলার গণ্ডি পেরিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে যে কজন নেতা স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন, মশিউর রহমান যাদু মিয়া তাঁদের মধ্যে অন্যতম। তাঁর আদর্শ ও কর্মময় জীবন নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক কর্মীদের জন্য আজও এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।
২ নং, উত্তর দুর্গাপুর ইউনিয়ন কৃষ্ণনগর। কুমিল্লা আদর্শ সদর
+
+