সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০৩:২৬ অপরাহ্ন
Logo
সর্বশেষ
● নিউইয়র্কে ট্যাক্সি চালিয়ে দেশে ছয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়লেন মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী ● কুমিল্লায় ওয়ার্ল্ড মিডিয়া প্রেস ক্লাবের সহসভাপতি নির্বাচিত হলেন সাংবাদিক শাহজাহান বাশার ● মাদক ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি পেলেন আইনজীবী হাবিবুল হক ● বাকেরগঞ্জে গণধর্ষণের অভিযোগ নিতে ওসির অস্বীকৃতি! উল্টো ভিকটিমকে ৭ বছরের জেলের ভয়! ● আইন, সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি: বিশেষ সম্মাননায় ভূষিত হলেন কুমিল্লার কৃতি সন্তান অ্যাডভোকেট হাবিবুল হক ● সুফিবাদ ও তাসাউফ তরিকতের মূল শিক্ষাই হলো ইসলামের মূল আদর্শ ও দর্শন-সাংবাদিক মোঃ শাহজাহান বাশার ● এডিএম স্টার অ্যাওয়ার্ড ২০২৫-এ বিশেষ অ্যাওয়ার্ড ও সম্মাননা পেলেন অ্যাডভোকেট মো. হাবিবুল হক ● শারদীয় দূর্গা পূজার আন্তর্জাতিক বিশ্বতান এর নাটক “সিদ্ধিদাতা গণেশ” ● আইন অঙ্গনে অবদানের স্বীকৃতি, ‘স্মার্ট এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড’ পেলেন হাবিবুল হক ● বাকেরগঞ্জে আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস উপলক্ষে র‍্যালি ও আলোচনা সভা

ট্যাক্সিচালকের স্টিয়ারিং থেকে জ্ঞানের দিশা—মোশাররফ হোসেনের আলোকযাত্রা

Reporter Name / ৯৭ Time View
Update : রবিবার, ৫ এপ্রিল, ২০২৬

২৭

মোঃ শাহজাহান বাশার

বাংলাদেশের গ্রামবাংলায় শিক্ষা বিস্তারের ইতিহাসে কিছু নাম নিভৃত আলোর মতো জ্বলে—প্রচারবিমুখ, কিন্তু প্রভাবশালী। কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার ধান্যদৌল গ্রামের সন্তান মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী তেমনই এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তার জীবনকাহিনি কেবল একজন প্রবাসীর অর্থ উপার্জনের গল্প নয়; এটি এক মানুষের আত্মত্যাগ, দায়বদ্ধতা এবং শিক্ষাকেন্দ্রিক সামাজিক বিপ্লবের জীবন্ত দলিল।

পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবাকে হারিয়ে ছোট বয়সেই পরিবারের দায়িত্ব তার কাঁধে এসে পড়ে। যে বয়সে একটি শিশুর স্কুলব্যাগ আর খেলাধুলায় ব্যস্ত থাকার কথা, সেই বয়সেই তিনি বুঝে যান জীবন মানে সংগ্রাম। অভাব-অনটন, অনিশ্চয়তা ও দায়িত্ববোধ তার চরিত্রকে গড়ে তোলে দৃঢ় ভিত্তির ওপর। জীবনের কঠিন বাস্তবতা তাকে থামিয়ে দেয়নি; বরং শিখিয়েছে—লড়াই করেই এগোতে হয়।

১৯৮২ সালে জীবিকার সন্ধানে তিনি পাড়ি জমান কাতারে। নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে কঠোর পরিশ্রমে কাটতে থাকে তার প্রবাসজীবনের প্রথম অধ্যায়। তপ্ত মরুভূমির রোদ, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ—সবকিছুর মাঝেও তার মনে লালিত হতে থাকে এক স্বপ্ন: নিজের গ্রামে শিক্ষার আলো জ্বালাবেন। প্রবাসের প্রতিটি ঘামঝরা দিন যেন সেই স্বপ্নের পুঁজি হয়ে জমা হতে থাকে।

চার বছর পর দেশে ফিরে ১৯৮৯ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘আবদুর রাজ্জাক খান চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয়’। বাবার স্মৃতিকে ধারণ করে গড়া এই প্রতিষ্ঠান আজ এমপিওভুক্ত এবং প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থী সেখানে অধ্যয়ন করছে। একটি বিদ্যালয় মানে শুধু একটি ভবন নয়—এটি একটি এলাকার সামাজিক জাগরণের কেন্দ্র। এই বিদ্যালয় ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন প্রজন্মের আত্মবিশ্বাস, সচেতনতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সংস্কৃতি।

১৯৮৯ সালেই তিনি পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। ১৯৯২ সাল থেকে ট্যাক্সি চালিয়ে উপার্জিত অর্থের বড় অংশ ব্যয় করতে থাকেন নিজ এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গঠনে। ব্যস্ত শহুরে জীবনে দিনরাত পরিশ্রম করেও তার হৃদয়ের টান ছিল নিজের গ্রামের প্রতি। প্রবাসে থেকেও তিনি ছিলেন গ্রামের উন্নয়নের নীরব কারিগর।

আজ তার প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছয়টি—দুটি কলেজ, দুটি মাদরাসা, একটি উচ্চ বিদ্যালয় ও একটি কিন্ডারগার্টেন। কয়েক হাজার শিক্ষার্থী এসব প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করছে। প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষার সুযোগ তৈরি হওয়ায় স্থানীয় শিক্ষার্থীদের আর দূরদূরান্তে যেতে হয় না। বিশেষ করে মেয়েদের শিক্ষার ক্ষেত্রে এই উদ্যোগ এক নীরব বিপ্লব সৃষ্টি করেছে।

শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়েই তিনি থেমে থাকেননি। এলাকায় দুটি পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করেছেন, যাতে বই পড়ার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। কারণ তিনি জানেন—শিক্ষা শুধু পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; জ্ঞানচর্চা ও চিন্তার বিকাশই প্রকৃত শিক্ষার প্রাণ।

নিজের নামে একটি ফাউন্ডেশন গড়ে ২০০ শিক্ষার্থীকে বৃত্তি দিয়েছেন। দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য এই সহায়তা অনেক সময় জীবন বদলে দেওয়ার মতো ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি ১০টি গৃহহীন পরিবারকে ঘর নির্মাণ করে দিয়েছেন। একটি ঘর মানে কেবল আশ্রয় নয়; এটি নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং নতুন করে বাঁচার শক্তি।

স্বাস্থ্যখাতেও তার অবদান অনন্য। একটি ডায়াবেটিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার জন্য প্রায় দুই কোটি টাকা মূল্যের জমি দান করেছেন। গ্রামাঞ্চলে বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়ার এই উদ্যোগ বহু মানুষের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

ধর্মীয় সম্প্রীতির ক্ষেত্রেও তিনি এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। ২০০৭ সালে ধান্যদৌল কালীমন্দির প্রাঙ্গণের শতবর্ষী বটগাছ রক্ষায় এক লাখ টাকা দিয়ে সেটি কিনে মন্দির কর্তৃপক্ষকে দান করেন। এটি প্রমাণ করে—তার মানবিকতা ধর্মের সীমানা অতিক্রম করে মানবতার বৃহত্তর পরিসরে বিস্তৃত।

অর্থ-সম্পদ অর্জনের পর অনেকেই ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্যকে অগ্রাধিকার দেন। কিন্তু মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী বেছে নিয়েছেন ভিন্ন পথ। ব্যক্তিজীবনে তিনি সাদামাটা, এখনো প্রবাসে থাকেন, কাজ করেন, এবং উপার্জনের বড় অংশ ব্যয় করেন শিক্ষাবিস্তার ও সমাজকল্যাণে। তার জীবনের দর্শন স্পষ্ট—শিক্ষাই উন্নয়নের টেকসই ভিত্তি।

আজকের প্রেক্ষাপটে তার জীবন আমাদের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। তিনি দেখিয়েছেন, একজন নির্মাণশ্রমিক বা ট্যাক্সিচালকও চাইলে একটি অঞ্চলের শিক্ষার মানচিত্র বদলে দিতে পারেন। প্রবাসের আয় শুধু ব্যক্তিগত উন্নতির জন্য নয়; তা দিয়ে দেশের মাটিতে ভবিষ্যৎ গড়া সম্ভব।

মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী কেবল একজন শিক্ষানুরাগী নন; তিনি এক স্বপ্নদ্রষ্টা সমাজসেবক, যিনি বিশ্বাস করেন—গ্রামের একটি শিশুর হাতে বই তুলে দেওয়া মানেই জাতির ভবিষ্যৎকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো। তার এই আলোকিত পথচলা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃত সাফল্য সম্পদে নয়—মানুষের জীবনে রেখে যাওয়া ইতিবাচক পরিবর্তনেই নিহিত।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

উপদেষ্টা পর্ষদ

প্রধান উপদেষ্টা
হুমায়ুন কবির জীবন
উপদেষ্টা ও পৃষ্ঠপোষক
আবুল হাসানাত
সম্পাদকীয় উপদেষ্টা
মোঃ শাহরিয়া সিকদার

সম্পাদকীয় পর্ষদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
মোঃ শরিফ হোসেন
নির্বাহী সম্পাদক
মোঃ শাহজাহান বাশার
উপসম্পাদক
সালাম মিয়া

কার্যালয় ও যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়

২ নং, উত্তর দুর্গাপুর ইউনিয়ন কৃষ্ণনগর। কুমিল্লা আদর্শ সদর

যোগাযোগ

+
+

ডিজাইন ও প্রযুক্তি সহায়তায়ঃ