নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সবুজবাগ থানায় কর্মরত এসআইসহ পাঁচ পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলায় নাম জড়ানো, হয়রানি, চাঁদা দাবি ও হুমকির অভিযোগ এনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ চারটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন দীন ইসলাম নামের এক মোটরপার্টস ব্যবসায়ী।
অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন সবুজবাগ থানার এসআই (নিঃ) এসআই সৈকত হোসেন সানি, এসআই আব্দুল কাইয়ুম, এএসআই ফেরদৌস রহমান, এএসআই আব্দুর রহমান, এএসআই মোঃ লিটন এবং কনস্টেবল মোঃ পারভেজ মিয়া।
অভিযোগপত্রটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ পুলিশের আইজিপি এবং ডিএমপি কমিশনার বরাবর পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
অভিযোগে দীন ইসলাম উল্লেখ করেন, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এসআই সৈকত হোসেন সানি সবুজবাগ থানায় যোগদান করেন। ওই সময় তাদের মধ্যে পরিচয় ও যোগাযোগ তৈরি হয়। পরবর্তীতে ব্যবসায়িক ও আর্থিক সমস্যার কারণে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং দীন ইসলাম কর্মসংস্থানের জন্য অন্যত্র কাজ শুরু করেন।
ভুক্তভোগীর অভিযোগ অনুযায়ী, গত ১৪ মে ২০২৬ তারিখে সবুজবাগ থানায় একটি মাদক মামলা (মামলা নং-১১, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৮-এর বিভিন্ন ধারা) দায়ের করা হয়।
তিনি দাবি করেন, ওই মামলায় তাকে (দীন ইসলাম) উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যদিও তিনি ঘটনার সঙ্গে কোনোভাবেই সম্পৃক্ত নন।
অভিযোগে আরও বলা হয়, ১৩ মে ২০২৬ তারিখে এসআই সৈকত হোসেন সানি ও তার সঙ্গীয় ফোর্স ডেমরার সারুলিয়া এলাকা থেকে মামলার এজাহারনামীয় এক আসামিকে গ্রেফতার করে আলামত উদ্ধার করেন। কিন্তু পরবর্তীতে একই মামলায় তাকে জড়ানো হয়, যা তিনি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও হয়রানিমূলক বলে দাবি করেন।
মামলার এক সাক্ষী জাহিদ হাসান জানান, তিনি দীন ইসলামকে চেনেন না এবং কখনো দেখেননি। তার অভিযোগ, তদন্তকালে এসআই সৈকত কেবল তার নাম ও পরিচয় জেনে তা নথিভুক্ত করেন, প্রকৃত কোনো তথ্য যাচাই করা হয়নি।
অভিযোগে বলা হয়, এসআই সৈকত ও তার সহযোগীরা মামলার ভয় দেখিয়ে দীন ইসলামের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা দাবি করেন। টাকা না দিলে ভবিষ্যতে আরও মামলায় নাম জড়ানোর হুমকিও দেওয়া হয় বলে তিনি অভিযোগ করেন।
ভুক্তভোগীর দাবি, এই পরিস্থিতির কারণে তিনি মানসিক চাপে রয়েছেন এবং ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একাধিক ব্যবসায়ী দাবি করেন, দীর্ঘদিন একই থানায় কর্মরত থাকার কারণে কিছু পুলিশ সদস্যের সঙ্গে বিভিন্ন অপরাধচক্রের যোগাযোগ তৈরি হয়েছে বলে তারা সন্দেহ করেন। মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ নেওয়ার অভিযোগও এলাকায় শোনা যায় বলে তারা জানান, তবে এসব অভিযোগের পক্ষে তারা সরাসরি প্রমাণ দিতে পারেননি।
থানা সূত্রে জানা যায়, এসআই সৈকত হোসেন সানির বিরুদ্ধে পূর্বেও কিছু অভিযোগের ভিত্তিতে বিভাগীয় তদন্ত চলমান রয়েছে। সেই প্রেক্ষিতে তার বদলির বিষয় আলোচনায় আসে। তবে অভিযোগকারীর দাবি, বদলির পরও তিনি একই থানায় প্রভাব বিস্তার করছেন।
ডিএমপির ডিসি (মিডিয়া) এন এম নাসিরুদ্দিন বলেন,কোনো পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে মাদক সংশ্লিষ্টতা বা অনিয়মের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে তদন্ত সাপেক্ষে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সবুজবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম জানান, এ ধরনের অভিযোগের বিষয়ে তিনি অবগত নন এবং বিষয়টি মিডিয়ার মাধ্যমে প্রথম জানতে পেরেছেন।
অভিযুক্ত এসআই সৈকত হোসেন সানি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন,
“পুলিশের চাকরি করি ভাই, মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে মামলা দিতে গেলে এমন অভিযোগ আসতেই পারে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, পুলিশের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তা দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা উচিত। প্রমাণিত হলে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে, আবার ভিত্তিহীন অভিযোগ হলে সেটিও খতিয়ে দেখা জরুরি।
মাদক মামলায় নাম জড়ানো, চাঁদা দাবি, হুমকি ও হয়রানির অভিযোগকে কেন্দ্র করে সবুজবাগ থানার কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তাকে নিয়ে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা তদন্তে প্রমাণিত হলে বিষয়টি আইনগত ও প্রশাসনিকভাবে গুরুতর মোড় নিতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।