মোঃ শাহজাহান বাশার,

লালমাই পাহাড়ের ‘সিলগালা’ তেলকূপ: রহস্য, গুঞ্জন নাকি গোপন বাস্তবতা? কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলার বড় ধর্মপুর এলাকার লালমাই পাহাড়কে ঘিরে বছরের পর বছর ধরে একটি রহস্যময় গুঞ্জন মানুষের মুখে মুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে। স্থানীয়দের অনেকেই বলেন—এখানে একসময় তেলের খনি পাওয়া গিয়েছিল, কিন্তু পরে রহস্যজনকভাবে সেটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। কেউ বলেন, গভীর রাতে হেলিকপ্টার এসে কূপ সিলগালা করে দেয়, আবার কেউ দাবি করেন সিসা ঢালাই করে মুখ বন্ধ করা হয়েছিল। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসায় মানুষের কৌতূহলও বেড়েছে কয়েকগুণ।

কুমিল্লার লালমাই পাহাড় এখন শুধু একটি পাহাড়ি অঞ্চল নয়, বরং এটি বহু মানুষের কাছে এক রহস্যের নাম। দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় জনমনে ঘুরপাক খাচ্ছে একটি প্রশ্ন—“লালমাই পাহাড়ে কি সত্যিই তেলের খনি পাওয়া গিয়েছিল?” আর যদি পাওয়া গিয়ে থাকে, তবে কেন সেটি হঠাৎ করেই বন্ধ করে দেওয়া হলো? এই প্রশ্নকে ঘিরেই বছরের পর বছর ধরে জন্ম নিয়েছে অসংখ্য গুজব, লোককথা ও রহস্যময় গল্প।

স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্যমতে, প্রায় দুই দশক আগে এলাকায় বড় ধরনের অনুসন্ধান কার্যক্রম চালানো হয়। বিদেশি প্রযুক্তি ও ভারী যন্ত্রপাতি এনে পাহাড়ের বিভিন্ন স্থানে গভীর খনন কাজ করা হয়েছিল। অনেকের দাবি, তারা নিজের চোখে মাটি থেকে তেলের মতো কালচে পদার্থ বের হতে দেখেছেন। আবার কেউ কেউ বলেন, অনুসন্ধান চলাকালে এলাকায় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল এবং সাধারণ মানুষকে সহজে কাছে যেতে দেওয়া হতো না।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই দাবি করেন, অনুসন্ধানের কিছুদিন পর হঠাৎ করেই সব কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এরপর কূপগুলোর মুখ বিশেষ উপায়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়। আর তখন থেকেই মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে নানা গল্প। কেউ বলেন, গভীর রাতে হেলিকপ্টার এসে কূপ সিলগালা করে যায়। কেউ দাবি করেন, কূপের ভেতরে সিসা ঢেলে স্থায়ীভাবে মুখ বন্ধ করা হয়েছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব গল্প নতুন করে ভাইরাল হওয়ায় আবারও আলোচনায় এসেছে লালমাই পাহাড়ের কথিত ‘তেলকূপ রহস্য’।

তবে বাস্তব অনুসন্ধান, সরকারি তথ্য ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ বলছে—ঘটনার পেছনে রহস্যের চেয়ে বাস্তবতাই বেশি। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স) প্রকৃতপক্ষেই লালমাই এলাকায় অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করে। ২০১৭-১৮ সালের দিকে “লালমাই-১” ও “লালমাই-২” নামে দুটি অনুসন্ধান কূপ খনন করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, অনুসন্ধানের সময় অল্প পরিমাণে হাইড্রোকার্বনের উপস্থিতি পাওয়া যায়। অর্থাৎ সেখানে তেল বা গ্যাস জাতীয় উপাদানের অস্তিত্ব ছিল—এ তথ্য পুরোপুরি গুজব নয়।

তবে মূল প্রশ্ন ছিল, সেই মজুত কি বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনের জন্য যথেষ্ট ছিল? জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, পরীক্ষামূলকভাবে দৈনিক আনুমানিক ২০ থেকে ২৫ ব্যারেলের মতো তেল পাওয়া যাচ্ছিল। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী এটি অত্যন্ত সীমিত উৎপাদন। একটি পূর্ণাঙ্গ তেলক্ষেত্র পরিচালনার জন্য যে পরিমাণ উৎপাদন প্রয়োজন, তার তুলনায় এটি ছিল খুবই কম।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো এলাকায় তেলের অস্তিত্ব পাওয়া গেলেই সেটি লাভজনক তেলক্ষেত্রে পরিণত হয় না। একটি তেলকূপ সচল রাখতে ভূগর্ভস্থ মজুতের পরিমাণ, দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা, উত্তোলন ব্যয়, তেলের মান, বাজারমূল্য এবং দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনের স্থিতিশীলতা বিবেচনায় নিতে হয়। লালমাইয়ের ক্ষেত্রে বড় যে সমস্যাগুলো সামনে আসে, তার মধ্যে অন্যতম ছিল খুব সীমিত উৎপাদন, তেলের সঙ্গে অতিরিক্ত পানি উঠে আসা, ভূগর্ভস্থ চাপ দ্রুত কমে যাওয়া এবং উত্তোলন ব্যয়ের তুলনায় লাভ কম হওয়া। ফলে প্রকল্পটি অর্থনৈতিকভাবে অলাভজনক হয়ে পড়ে।

স্থানীয়দের মুখে সবচেয়ে বেশি শোনা যায় “সিসা ঢেলে কূপ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল” এমন দাবি। কিন্তু জ্বালানি প্রকৌশলীরা বলছেন, এটি আসলে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি নিরাপত্তা প্রক্রিয়ার সাধারণ মানুষের ভাষ্য মাত্র। তেল ও গ্যাস শিল্পে কোনো কূপে পর্যাপ্ত মজুত না থাকলে সেটিকে “Plug and Abandon” পদ্ধতিতে স্থায়ীভাবে বন্ধ করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় কূপের গভীরে বিশেষ সিমেন্ট ব্যবহার করা হয়, ধাতব সুরক্ষা স্তর বসানো হয় এবং ভবিষ্যতে গ্যাস লিক, আগুন কিংবা ভূগর্ভস্থ পানিদূষণের ঝুঁকি ঠেকাতে কূপ সুরক্ষিতভাবে সিল করা হয়। অর্থাৎ “সিলগালা” বা “সিসা ঢালাই” কথাগুলোর পেছনে রহস্য নয়, বরং প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা ব্যবস্থাই কাজ করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, দেশের জ্বালানি সম্পদ নিয়ে মানুষের স্বাভাবিক আগ্রহ এবং পর্যাপ্ত তথ্যের অভাব থেকেই এসব গুজবের জন্ম। অনেক সময় অনুসন্ধান প্রকল্পে নিরাপত্তাজনিত কারণে সাধারণ মানুষের প্রবেশ সীমিত রাখা হয়। এতে মানুষের মনে রহস্যের জন্ম নেয়। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মুখে মুখে সেই গল্প আরও নাটকীয় রূপ পায়। স্থানীয়দের অনেকেই এখনও বিশ্বাস করেন—“বড় কোনো সম্পদ গোপন করে রাখা হয়েছে।” যদিও এখন পর্যন্ত এমন দাবির পক্ষে কোনো সরকারি বা বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, লালমাই পাহাড়ে তেলের অস্তিত্বের বিষয়টি সত্য হলেও সেটি দেশের জ্বালানি চাহিদা পূরণ করার মতো বড় কোনো মজুত ছিল না। তবে আধুনিক প্রযুক্তি ও উন্নত অনুসন্ধান পদ্ধতি ব্যবহার করে ভবিষ্যতে আবারও অনুসন্ধান চালানো হলে ভিন্ন ফল আসতে পারে। কারণ পৃথিবীর অনেক ছোট তেলক্ষেত্র পরবর্তীতে উন্নত প্রযুক্তির কারণে লাভজনক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

স্থানীয়দের অনেকেই মনে করেন, সরকার চাইলে অঞ্চলটিকে নতুনভাবে বৈজ্ঞানিক জরিপের আওতায় আনতে পারে। এতে যেমন বাস্তবতা আরও পরিষ্কার হবে, তেমনি বহু বছরের রহস্য ও গুজবেরও অবসান ঘটবে।

সবশেষে বলা যায়, লালমাই পাহাড়ের তেলকূপ ঘিরে রহস্য, লোককথা, মানুষের কৌতূহল এবং বাস্তব অনুসন্ধান—সবকিছু মিলিয়ে এটি এখন এক আলোচিত অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে। বাস্তবতা বলছে, সেখানে তেলের সামান্য উপস্থিতি পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু সেটি বাণিজ্যিকভাবে কার্যকর না হওয়ায় আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনেই কূপগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবুও পাহাড়ের নীরবতার আড়ালে আজও মানুষের মনে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খায়—“সত্যিই কি সব গল্প শেষ হয়ে গেছে, নাকি লালমাই পাহাড়ের বুকের নিচে এখনও লুকিয়ে আছে অজানা কোনো সম্ভাবনা?”