মোঃ শাহজাহান বাশার
জীবিকার তাগিদে পাড়ি জমিয়েছিলেন বিদেশে। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে দীর্ঘদিন ট্যাক্সি চালিয়ে গড়ে তুলেছেন নিজের কর্মজীবন। কিন্তু প্রবাসে উপার্জিত অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে তাঁর ভাবনায় ছিল জন্মভূমি, নিজ এলাকার শিক্ষার্থী এবং সাধারণ মানুষের কল্যাণ। সেই ভাবনা থেকেই কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার ধান্যদৌল গ্রামের মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী শিক্ষা বিস্তার ও সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হন।
তাঁর উদ্যোগে নিজ এলাকায় একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা, গ্রন্থাগার স্থাপন এবং স্বাস্থ্যসেবা ও আবাসনসংশ্লিষ্ট জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে অবদানের কথা বিভিন্ন প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এসব উদ্যোগের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ প্রতিষ্ঠা।
প্রবাসে দীর্ঘ কর্মজীবনের উপার্জন নিজ এলাকার মানুষের শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণে কাজে লাগানোর এই উদ্যোগ প্রবাসী বাংলাদেশিদের সামাজিক দায়বদ্ধতা ও দেশমুখী বিনিয়োগের একটি তাৎপর্যপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
কাতার থেকে নিউইয়র্ক: প্রবাসজীবনের পথচলা
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৩ সালে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার পর মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী জীবিকার সন্ধানে কাতারে যান। পরে ১৯৮৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। নিউইয়র্কে শুরু করেন ট্যাক্সি চালানোর কাজ।
প্রবাসে তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, ব্যক্তিগত জীবনের আর্থিক নিরাপত্তা অর্জনের পাশাপাশি জন্মভূমির উন্নয়নের বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া। নিজ এলাকার শিক্ষার্থীরা যেন বাড়ির কাছাকাছি শিক্ষার সুযোগ পায় এবং উচ্চশিক্ষার জন্য দূরবর্তী এলাকায় যাওয়ার বাধা কিছুটা হলেও কমে, সেই লক্ষ্য সামনে রেখে তিনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রবাসজীবনের উপার্জন নিজ এলাকার শিক্ষা ও সমাজকল্যাণে কাজে লাগানোর এই প্রচেষ্টা ব্যক্তিগত সাফল্যের পাশাপাশি সামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখার একটি উদাহরণ।
বিজয় দিবসে কলেজ প্রতিষ্ঠা
মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর শিক্ষা উদ্যোগের অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ। সরবরাহ করা তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৯ সালের ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবসে প্রায় ১ দশমিক ১৮ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়।
স্থানীয় পর্যায়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের লক্ষ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত এই কলেজ ব্রাহ্মণপাড়া অঞ্চলের শিক্ষাব্যবস্থার আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে বলে বিভিন্ন প্রকাশিত তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষাক্রম, অধিভুক্তি, বিভাগ, শিক্ষার্থীসংখ্যা ও সাম্প্রতিক পরীক্ষার ফলাফল সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন। সরবরাহ করা তথ্যে সাধারণ শিক্ষা শাখায় ৯৪ দশমিক ১৪ শতাংশ এবং কারিগরি শাখায় শতভাগ পাসের উল্লেখ রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাবর্ষ, পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ও আনুষ্ঠানিক ফলাফলের নথি নিশ্চিত না হওয়ায় এসব পরিসংখ্যানকে চূড়ান্তভাবে যাচাইকৃত ফলাফল হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে না।
ছয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ
মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীকে নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাঁর উদ্যোগে নিজ এলাকায় ছয়টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে স্থানীয় শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণে তাঁর ভূমিকার বিষয়টি উঠে এসেছে।
বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদে মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রাপ্যতা শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষার্থীদের যাতায়াত ব্যয়, দূরত্ব ও পারিবারিক আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক সময় শিক্ষাজীবন বাধাগ্রস্ত হয়। স্থানীয় পর্যায়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা এসব বাধা কমাতে সহায়ক হতে পারে।
তবে ছয়টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পূর্ণাঙ্গ নাম, প্রতিষ্ঠাকাল, বর্তমান কার্যক্রম এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্বীকৃতির তথ্য যাচাই করা হলে তাঁর শিক্ষা উদ্যোগের প্রকৃত ব্যাপ্তি আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরা সম্ভব হবে।
গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা ও জ্ঞানচর্চায় অবদান
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি গ্রন্থাগার স্থাপনের উদ্যোগও তাঁর সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে বিভিন্ন প্রকাশিত তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
সরবরাহ করা তথ্য অনুযায়ী, তিনি দুটি গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছেন। গ্রন্থাগার শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের জন্য বই পড়া, জ্ঞান অর্জন এবং নিয়মিত পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
বর্তমান সময়ে ডিজিটাল তথ্যের সহজলভ্যতা বাড়লেও বইভিত্তিক জ্ঞানচর্চা, গবেষণা ও পাঠাভ্যাসের গুরুত্ব কমেনি। স্থানীয় পর্যায়ে গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ কার্যকরভাবে পরিচালিত হলে তা শিক্ষার্থীদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি জ্ঞান ও মননশীলতা বিকাশেও ভূমিকা রাখতে পারে।
গ্রন্থাগার দুটির অবস্থান, সংগ্রহে থাকা বইয়ের সংখ্যা, পাঠকসেবা ও বর্তমান কার্যক্রমের তথ্য পাওয়া গেলে এ উদ্যোগের বাস্তব প্রভাব সম্পর্কে আরও নির্দিষ্টভাবে জানা যাবে।
স্বাস্থ্যসেবা ও আবাসন উদ্যোগেও সম্পৃক্ততা
শিক্ষার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রেও মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর অবদানের কথা প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
সরবরাহ করা তথ্যে এলাকায় ডায়াবেটিস হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার জন্য জমি দান এবং গৃহহীন মানুষের আবাসনসংশ্লিষ্ট উদ্যোগে তাঁর অবদানের কথা বলা হয়েছে। এসব উদ্যোগের বাস্তবায়ন, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বর্তমান অবস্থা এবং উপকারভোগীর সংখ্যা সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া গেলে তাঁর সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডের পরিধি আরও পরিষ্কার হবে।
স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও আবাসন—এই তিনটি ক্ষেত্রই মানুষের জীবনমান উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এসব ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত উদ্যোগ কার্যকর ও টেকসই প্রতিষ্ঠানে রূপ নিলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর দীর্ঘমেয়াদি উপকার হতে পারে।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য একটি সম্ভাবনাময় দৃষ্টান্ত
প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স পাঠানোর মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। এর পাশাপাশি কেউ কেউ নিজ এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, গ্রন্থাগার ও অন্যান্য জনকল্যাণমূলক অবকাঠামো গড়ে তুলতেও উদ্যোগী হন।
মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর কর্মকাণ্ডের বিবরণ সেই বৃহত্তর বাস্তবতার দিকেই দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বিদেশে কর্মসংস্থানের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ পরিকল্পিতভাবে দেশের শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নে বিনিয়োগ করা গেলে তা স্থানীয় পর্যায়ে নতুন সুযোগ তৈরিতে সহায়ক হতে পারে।
তবে এ ধরনের উদ্যোগের সাফল্য শুধু প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার মান বজায় রাখা, দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ, স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা, আর্থিক স্থায়িত্ব এবং সাধারণ মানুষের জন্য সেবার সুযোগ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যক্তি উদ্যোগের সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন জরুরি
একজন ব্যক্তির উদ্যোগে গড়ে ওঠা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা জনকল্যাণমূলক অবকাঠামোর প্রকৃত অবদান মূল্যায়নের জন্য প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য তথ্য ও উপাত্ত।
মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর শিক্ষা উদ্যোগের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের বর্তমান শিক্ষার্থীসংখ্যা, শিক্ষকসংখ্যা, পরীক্ষার ফলাফল, উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি এবং প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। একইভাবে গ্রন্থাগার ও স্বাস্থ্যসেবামূলক উদ্যোগের ব্যবহার, সেবার মান এবং উপকারভোগীর সংখ্যা জানা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, প্রাক্তন শিক্ষার্থী, স্থানীয় প্রশাসন এবং উপকারভোগীদের বক্তব্য যুক্ত করা হলে তাঁর উদ্যোগের ইতিবাচক দিক ও বাস্তব প্রভাব সম্পর্কে একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া সম্ভব হবে।
জন্মভূমির প্রতি দায়বদ্ধতার গল্প
নিউইয়র্কে ট্যাক্সি চালিয়ে কর্মজীবন গড়ে তোলা এবং সেই উপার্জনের একটি অংশ নিজ এলাকার শিক্ষা ও সমাজকল্যাণে ব্যয় করার উদ্যোগ—মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর জীবনকাহিনির প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে উঠে এসেছে।
তাঁর উদ্যোগের বিস্তারিত ও যাচাইকৃত তথ্য নথিভুক্ত করা গেলে তা শুধু একজন প্রবাসীর ব্যক্তিগত অবদানের বিবরণ হবে না; বরং প্রবাসী বাংলাদেশিদের দক্ষতা, অর্থ ও অভিজ্ঞতা দেশের স্থানীয় উন্নয়নে কীভাবে কাজে লাগানো যায়, সে বিষয়েও আলোচনার সুযোগ তৈরি করবে।
শিক্ষা ও সমাজকল্যাণে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের গুরুত্ব এখানেই—এর সুফল একজন ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; যথাযথ ব্যবস্থাপনা ও ধারাবাহিকতার মাধ্যমে তা পরবর্তী প্রজন্মের জন্যও সুযোগ তৈরি করতে পারে।