নিজস্ব প্রতিবেদন

আমরা সবাই পরিবর্তন চাই। দেশ বদলাবে, সমাজ বদলাবে, দুর্নীতি কমবে, অন্যায় দূর হবে—এমন প্রত্যাশা আমাদের প্রায় সবারই। চায়ের আড্ডা থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অফিসের টেবিল থেকে রাজপথ—সব জায়গাতেই আমরা পরিবর্তনের কথা বলি। কিন্তু খুব কম মানুষই নিজেকে প্রশ্ন করি—পরিবর্তনটা শুরু হবে কোথা থেকে?

আমরা চাই অন্যরা সৎ হোক, কিন্তু নিজের ছোটখাটো অসততাকে অনেক সময় ‘চলেই তো’ বলে এড়িয়ে যাই। আমরা চাই দুর্নীতি বন্ধ হোক, কিন্তু নিজের সুবিধার জন্য নিয়ম ভাঙতে দ্বিধা করি না। আমরা চাই সমাজে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সবাই কথা বলুক, অথচ অন্যায় যখন নিজের সামনে ঘটে, তখন অনেকেই নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে থাকি। এভাবেই পরিবর্তনটা সবসময় অন্য কারও কাছ থেকে প্রত্যাশা করতে করতে আমরা নিজেরাই পরিবর্তনের বাইরে থেকে যাই।

একটি দেশ কেবল সরকারের সিদ্ধান্তে বদলায় না। একটি সমাজ কেবল আইন করে বদলে ফেলা যায় না। পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো মানুষের মানসিকতা। একজন মানুষ যখন ঘুষ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, সেখান থেকেই পরিবর্তনের শুরু। একজন ব্যবসায়ী যখন মাপে কম না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, সেখান থেকেও পরিবর্তনের শুরু। একজন শিক্ষক যখন দায়িত্বকে শুধু চাকরি হিসেবে না দেখে মানুষের ভবিষ্যৎ গড়ার দায়িত্ব হিসেবে দেখেন, সেখানেও পরিবর্তনের জন্ম হয়। একজন সাংবাদিক যখন চাপ, ভয় কিংবা প্রলোভনের কাছে মাথা নত না করে সত্য তুলে ধরেন, তখনও সমাজে পরিবর্তনের একটি বীজ বপন হয়।

পরিবর্তন মানে সবসময় বড় কোনো আন্দোলন নয়। কখনো কখনো পরিবর্তন খুব ছোট একটি সিদ্ধান্তের নাম। রাস্তার পাশে ময়লা না ফেলা পরিবর্তন, অন্যের অধিকারকে সম্মান করা পরিবর্তন, মিথ্যা না বলা পরিবর্তন, অন্যায় সুবিধা গ্রহণ না করা পরিবর্তন, বিপদে একজন মানুষের পাশে দাঁড়ানোও পরিবর্তন।

আমরা প্রায়ই বলি, ‘দেশের মানুষ বদলানো দরকার।’ কিন্তু দেশের মানুষ বলতে তো আমরাই। তাহলে প্রশ্নটা অন্যদের নিয়ে না করে নিজেদের নিয়ে করা উচিত—আমি কি বদলেছি?

আমরা যে সমাজ নিয়ে হতাশ, সেই সমাজেরই একটি অংশ আমরা। তাই সমাজের সমস্যার জন্য শুধু অন্যকে দায়ী করলে চলবে না; নিজের দায়টুকুও স্বীকার করতে হবে। একটি ভালো সমাজ গড়ে ওঠে শুধু বড় বড় নীতি ও বক্তৃতায় নয়, বরং সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের ছোট ছোট ভালো কাজের মধ্য দিয়ে।

আমাদের সন্তানদের আমরা ভালো ভবিষ্যৎ দিতে চাই। কিন্তু ভবিষ্যৎ শুধু বড় বাড়ি, ভালো চাকরি কিংবা ব্যাংক ব্যালান্স দিয়ে তৈরি হয় না। আমরা যদি তাদের একটি সৎ, নিরাপদ ও মানবিক সমাজ দিতে চাই, তাহলে সেই সমাজ তৈরির কাজ আজ থেকেই শুরু করতে হবে। সন্তানকে শুধু ভালো ফলাফল করার শিক্ষা দিলেই হবে না, তাকে সত্য বলার শিক্ষা দিতে হবে; অন্যের অধিকারকে সম্মান করার শিক্ষা দিতে হবে; দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষা দিতে হবে।

একদিন সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে—এই অপেক্ষা করতে করতে অনেক সময় জীবন পার হয়ে যায়। কোনো এক অদৃশ্য ‘কেউ’ এসে সমাজকে বদলে দেবে—এই প্রত্যাশাও বাস্তবসম্মত নয়। পরিবর্তনের জন্য আমাদেরই এগিয়ে আসতে হবে।

রাষ্ট্রের কাছে আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, প্রশাসনের কাছে জবাবদিহি চাইব, জনপ্রতিনিধিদের কাছে দায়িত্বশীলতা দাবি করব—এগুলো আমাদের নাগরিক অধিকার। কিন্তু একই সঙ্গে নিজেদের দায়িত্বও পালন করতে হবে। কারণ শুধু অধিকার দাবি করে একটি সুন্দর দেশ তৈরি হয় না; দায়িত্ব পালন করেও দেশ গড়তে হয়।

আমরা যদি চাই দুর্নীতি কমুক, তাহলে দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়া বন্ধ করতে হবে। আমরা যদি চাই অপরাধ কমুক, তাহলে অপরাধীর পরিচয়ের চেয়ে অপরাধকে বড় করে দেখতে হবে। আমরা যদি চাই সমাজে মানবিকতা ফিরুক, তাহলে নিজের আচরণেই মানবিকতার চর্চা করতে হবে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার সময় শুধু দেখতে হবে না—অন্যায়টি কার বিরুদ্ধে বা কার দ্বারা সংঘটিত হয়েছে; দেখতে হবে অন্যায়টি আসলে অন্যায় কি না।

একটি প্রদীপ পুরো শহরের অন্ধকার দূর করতে না পারলেও নিজের চারপাশের অন্ধকারটুকু দূর করতে পারে। পরিবর্তনও তেমনই। একজন মানুষ হয়তো পুরো দেশ বদলে দিতে পারবেন না, কিন্তু নিজের পরিবার, কর্মক্ষেত্র ও আশপাশের মানুষকে প্রভাবিত করতে পারেন। সেই ছোট পরিবর্তনই একসময় বড় পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করে।

তাই আসুন, শুধু প্রশ্ন না করি—দেশ কবে বদলাবে? সমাজ কবে বদলাবে? অন্যরা কবে ভালো হবে? বরং আজ নিজেদের কাছে একটি প্রশ্ন রাখি—আমি কীভাবে বদলাতে পারি?

কারণ পরিবর্তনের জন্য হয়তো আমাদের আরও অনেক বছর অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। পরিবর্তনের অপেক্ষায় না থেকে পরিবর্তনের শুরু হোক আমাদের দিয়ে। আজ একজন দিয়ে শুরু হোক, আগামীকাল আরও দশজন যুক্ত হোক, একদিন সেই পরিবর্তনই হয়ে উঠুক একটি সুন্দর, মানবিক ও দায়িত্বশীল সমাজের ভিত্তি।

দেশ বদলানোর স্বপ্ন দেখার আগে, নিজেকে বদলানোর সাহসটা আমাদের অর্জন করতে হবে। কারণ একটি দেশের প্রকৃত পরিবর্তন শুরু হয় রাজধানীর বড় কোনো ভবন থেকে নয়, শুরু হয় একজন সাধারণ মানুষের বিবেক থেকে।

পরিবর্তনের অপেক্ষায় নয়—পরিবর্তনের শুরু হোক আমাদের দিয়ে।